অপরাধ

১৫ আগস্ট ঘিরে লুকোচুরি, শোক পালনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন কৌশল

  admin ১৪ আগস্ট ২০২৫ , ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

প্রান্ত পারভেজ : ১৫ আগস্ট যেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থাকাকালীন সময়ে এই দিনটিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘনঘটা করে নানা আয়োজন করতেন তারা। আর এ সকল আয়োজনে খরচ করা হতো রাষ্ট্রীয় সম্পদ। আবার কোন কোন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই ১৫ আগস্ট পালনে চাঁদাবাজি করতো হরদম। মাইক বাজিয়ে এলাকা গরম করা, বড় বড় গরু জবাই করে কাঙ্গালী ভোজ নামে রান্না করে খেতো নিজ দলের কাঙ্গালরাই। এই খাবার ভাগ্যে জুটতো না কোন গরিব, অসহায় বা কাঙ্গালদের। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। টানা ১৭ বছর দেশের মানুষ এবং বিরোধীদলকে দমন নিপীড়নের পর, গত বছর ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এর পর নিষিদ্ধ করা হয় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের সকল কার্যক্রম। তবে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম প্রকাশ্যে বন্ধ থাকলেও, অভিযোগ উঠছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় তারা গোপনে ১৫ আগস্ট পালনের আয়োজন করছে।

কারণ গত ১৩ই আগস্ট রাতে লন্ডন থেকে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পুত্র শেখ ওয়াজেদ জয়, তার নিজ ফেসবুক একাউন্টে একটি ভিডিও বার্তায় দেশের সকল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ১৫ আগস্ট মৃত্যুবার্ষিকী পালনের নির্দেশ দেন। তার প্রেক্ষিতেই নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে এটি পালনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কিছু এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দোয়া মাহফিল কিংবা সমাজসেবা কর্মসূচির আড়ালে গোপনে দলীয় কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো হচ্ছে ব্যক্তিগত বাসা, কমিউনিটি সেন্টার, কিংবা অল্প কিছু মানুষের উপস্থিতিতে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়ানো যায়। আবার এ সকল অনুষ্ঠানের অর্থদাতার ভূমিকা পালন করছেন বিভিন্ন এলাকা ও পাড়ামহল্লায় গ্রেফতার না হওয়া আওয়ামী লীগের সেই সকল সক্রিয় নেতাকর্মীরা। যারা এখনো আওয়ামী লীগের সময়ের মতোই ব্যবসা-বাণিজ্য করে পাড়া মহল্লায় দেদারসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সতর্কবার্তা

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন এই ঘটনাকে সরাসরি গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি অবমাননা বলে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, যে দলটি জনগণের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত ও নিষিদ্ধ হয়েছে, তাদের যেকোনো প্রকাশ্য বা গোপন কর্মসূচি জাতীয় সংহতির জন্য হুমকি।
এক নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক বলেন, “আওয়ামী লীগের এই আয়োজনগুলো যদি উপেক্ষা করা হয়, তবে তারা আবার সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ চালাতে পারে। ১৫ আগস্টের নামে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরির চেষ্টা হলে তা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে।”

গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রশাসনের অবস্থান

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ১৫ আগস্ট ঘিরে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে। ডিএমপির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা গোপন সূত্রের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করছি। অনুমোদনবিহীন যেকোনো সভা-সমাবেশ, শোকসভা বা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত আমরা।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা এসেছে, যদি নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো সদস্য বা নেতা ১৫ আগস্ট পালনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের আটক করা হবে এবং বিদ্যমান আইনে মামলা করা হবে।

জনমতের প্রতিক্রিয়া

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকে লিখেছেন, গণঅভ্যুত্থানে যে লাখো মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি অবমাননা হবে যদি পরাজিত ও নিষিদ্ধ দল আবার সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। অন্যদিকে কিছু নাগরিকরা মনে করছেন, ইতিহাসের ঘটনাকে স্মরণ করা অপরাধ নয়, তবে এর মাধ্যমে যদি রাজনৈতিক লাভের চেষ্টা হয়, তাহলে তা বন্ধ হওয়া উচিত।

উপসংহার

১৫ আগস্টকে ঘিরে রাজনৈতিক আবেগ ও ঐতিহাসিক স্মৃতি সবসময়ই দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এবারের পরিস্থিতি বিশেষ সংবেদনশীল—কারণ নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের যেকোনো ইঙ্গিত বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থায় বড় ধাক্কা দিতে পারে। তাই প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ, কিভাবে আইন মেনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা যায়, একই সাথে জাতীয় ঐক্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়।

আরও খবর:

Sponsered content