অপরাধ

সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় রাজনৈতিক পরিচয়ে জমি দখল ও অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে নির্যাতনের অভিযোগ

  admin ২৪ আগস্ট ২০২৫ , ৩:২৩ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ

কাজী আশরাফুল হাসান : সিরাজগঞ্জ জেলার সলঙ্গা থানা এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জমি দখল, অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সলঙ্গা থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম গংদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার সংবাদ সম্মেলন করে বিচার ও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে।

দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ থেকে সংঘর্ষ

ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, সলঙ্গা থানার ধুবিল ইউনিয়নের চৌধুরী ঘুঘাট গ্রামে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। মৃত আব্দুর রশিদের কন্যা মদিনা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, তাদের খাজনা খারিজকৃত জমি দখলের জন্য আব্দুল আলীমের শ্বশুরপক্ষ বহু বছর ধরে ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে। এ নিয়ে আদালতে মামলা (নং-৬৮/২১ চৌহালী) দায়ের করা হলেও চলতি বছরের ২০ মার্চ মামলায় তারা পরাজিত হয়।

কিন্তু আদালতের রায় অমান্য করে গত ১৭ আগস্ট রবিবার আব্দুল আলীমের নির্দেশে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে প্রতিপক্ষ দল জমিতে প্রবেশ করে জোরপূর্বক ধানের চারা রোপণ শুরু করে।

অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর ওপর নির্মম নির্যাতন

গত কয়েকদিন আগে সলঙ্গা থানা বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন ভুক্তভোগীরা, ভুক্তভোগী মদিনা খাতুন সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, “আমরা জমি রক্ষা করতে গেলে তারা হামলা চালায়। আমার ছোট বোন নাজমা খাতুন (৩৫), যিনি ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তাকেও ছাড় দেওয়া হয়নি। তাকে নির্মমভাবে মারপিট করা হয়। মোবাইলে ভিডিও ধারণ করতে গেলে হামলাকারীরা ফোন ছিনিয়ে নেয়।”

চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত নাজমাকে দ্রুত সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে তিনি এখনও চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরিবার শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

মামলা দায়ের ও আইনের পদক্ষেপ

ঘটনার পর অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মা মোছাঃ সিরিয়া খাতুন (৬৫) বাদী হয়ে সিরাজগঞ্জ সলঙ্গা থানার আমলী আদালতে আব্দুল আলীমসহ মোট ১১ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। তবে মামলার পরও আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের। এতে তারা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহার

স্থানীয়রা জানান, আব্দুল আলীম দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি’র রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এলাকায় দখলবাজি, হুমকি ও নানা প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তিনি বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হলেও সেই পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে সামাজিক ও আইনি প্রতিরোধকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন।

একজন স্থানীয় প্রবীণ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কি আইন ভিন্ন হবে? আদালতে হেরে যাওয়ার পরও যদি কেউ জমি দখল করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”

নারীর নিরাপত্তাহীনতার জ্বলন্ত উদাহরণ

এ ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো, গ্রামীণ সমাজে প্রভাবশালী মহল রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে নারীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালাতে দ্বিধা করছে না। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর হামলা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনই নয়, এটি একটি জঘন্য অপরাধ।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, “আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের বিরোধী নই। আমরা শুধু আমাদের পৈতৃক জমি রক্ষা করতে চাই। আদালতে হেরে যাওয়ার পরও প্রভাব খাটিয়ে আমাদের পরিবারকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।”

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারটি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যদি এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে তারা আবারও আমাদের ক্ষতি করতে পারে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।”

বিশ্লেষণ: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ

সিরাজগঞ্জের সলঙ্গার এই ঘটনাটি গ্রামীণ সমাজে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখা হয় তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আদালতের রায় অমান্য করে শক্তির জোরে জমি দখল শুধু আইনের প্রতি অবমাননাই নয়, এটি সমাজে আইনহীনতা ও ভয়-ভীতি ছড়ানোর নগ্ন প্রদর্শন।

যতদিন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া হবে, ততদিন সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীন থাকবে। এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তার না হলে আইনশৃঙ্খলার প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—আইনের শাসন কি রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে বারবার হেরে যাবে, নাকি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে?

আরও খবর:

Sponsered content