admin ২ অক্টোবর ২০২৫ , ২:১৫ অপরাহ্ণ প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরের পীরগাছার পর মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বিশেষজ্ঞরা জেলার পীরগাছার আটজন অ্যানথাক্স আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করেছেন।

মানুষের অ্যানথ্রাক্স মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের অ্যানথ্রাক্স হয় পরিপাকতন্ত্রে, আরেক ধরনের অ্যানথ্রাক্স শরীরের বাইরের অংশে সংক্রমণ ঘটায়।
পরিপাকতন্ত্রে অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর সংক্রমণ হলে সাধারণত হালকা জ্বর, মাংসপেশীতে ব্যথা, গলা ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে বাংলাদেশে যে অ্যানথ্রাক্স দেখা যায় তা শরীরের বাইরের অংশে প্রভাব ফেলে। এ ধরনের অ্যানথ্রাক্সে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফোঁড়া বা গোটা হয়ে থাকে। ফোঁড়া ঠিক হয়ে গেলে হাতে, মুখে বা কাঁধের চামড়ায় দাগ দেখা যেতে পারে।
যেসব এলাকায় গবাদিপশু পালন করা হয় সেসব এলাকাতেই সাধারণত অ্যানথ্রাক্সের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ একটি তীব্র ও গুরুতর সংক্রামক রোগ, যা ব্যাসিলাস অ্যান্থ্রাসিস নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে।
ব্যাসিলাস গণের অন্যান্য সদস্যের মতো অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু Bacillus anthracis-ও প্রতিকূল পরিবেশে রেণু (স্পোর) হিসাবে সুপ্ত অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে। সুপ্ত দশায় এই জীবাণু শতাব্দীর পর শতাব্দীও টিকে থাকতে পারে। সব মহাদেশে, এমনকি কুমেরুতেও এরকম স্পোর পাওয়া গেছে। নিঃশ্বাসের সাথে, ত্বকের ক্ষত দিয়ে, কিংবা খাদ্যের মাধ্যমে এই জীবাণুর রেণু দেহে প্রবেশ করার পরে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠে এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।
অ্যানথ্রাক্স সাধারণত বন্য এবং গৃহপালিত লতাপাতাভোজী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আক্রান্ত করে। এ সকল প্রাণী ঘাস খাওয়ার সময় বা মাঠের চরার সময় খাওয়ার সাথে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে রেণু প্রাণীর ভিতরে ঢুকে গেলে সংক্রমণ শুরু হয়। লতাপাতা বা ঘাস খাওয়ার সময়ই বেশির ভাগ প্রাণী অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়। মাংসাশী প্রাণী একই পরিবেশে বাস করে অথবা আক্রান্ত প্রাণী খাওয়ার ফলে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে আসলে বা আক্রান্ত প্রাণীর মাংস খাওয়ার ফলে অ্যানথ্রাক্স মানুষের শরীরেও সরাসরি সংক্রমিত হতে পারে।
অ্যানথ্রাক্স রেণু ইন ভিট্রো (অর্থাৎ পরীক্ষা নল তথা টেস্ট টিউব) পদ্ধতিতে তৈরি করা যায়, যা জৈবিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অ্যানথ্রাক্স সরাসরি এক আক্রান্ত পশু বা ব্যক্তির থেকে অন্য পশু বা ব্যক্তির শরীরে ছড়ায় না, এটি রেণুর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। এর রেণু জামাকাপড় বা জুতার মাধ্যমে বহন করা যায়। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত জীবের মৃতদেহ অ্যানথ্রাক্স রেণুর একটি অন্যতম উৎস।
অ্যানথ্রাক্স নামটি এসেছে গ্রিক শব্দ অ্যানথ্রাক্স থেকে যার অর্থ কয়লা। ১৮৭৫ সালে জার্মান বিজ্ঞানী রোবের্ট কখ প্রথম অ্যানথ্রাক্স সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াটি শনাক্ত করেন।
অ্যানথ্রাক্স গরু, ছাগল, মহিষ-এই ধরনের প্রাণীর মধ্যে প্রথম দেখা যায়। এসব প্রাণীর মাধ্যমেই অ্যানথ্রাক্স মানুষের মধ্যে ছড়ায়। মূলত অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর মাংস কাটার সময় মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স ছড়ানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
পশু জবাই করা, সেটির মাংস কাটাকাটি করা এবং মাংস ধোয়া বা রান্নার সময় অনেকক্ষণ মাংস, রক্ত ও হাড্ডির সংস্পর্শে থাকতে হয়। সে সময় আক্রান্ত পশুর রক্তের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে অ্যানথ্রাক্স।
মাংস কাটাকাটির সময় মানুষের শরীরের চামড়ায় কোনোরকম ক্ষত থাকলে তার দেহে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু প্রবেশ করার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আমাদের দেশে পশুর অ্যানথ্রাক্স হলেও অনেকসময় তা জবাই করে মাংস কম দামে বিক্রি করে ফেলা হয়। ওই মাংস কাটাকাটি করার সময় অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
মানুষ থেকে মানুষে অ্যানথ্রাক্স ছড়ায় না, কিন্তু মানুষের শরীর এবং পোশাক অ্যানথ্রাক্স জীবাণু বহন করতে পারে। শরীর থেকে জীবাণু দূর করার জন্য ব্যাকটেরিয়া নিরোধক সাবান দিয়া গোসল করতে হবে। গোসলের পানি ব্লিচ বা কোনও ব্যাকটেরিয়া নিরোধক দ্বারা শোধিত করতে হবে। জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত জিনিসপত্র ৩০ মিনিটের অধিক সময় ধরে ফুটাতে হবে। কোনো জায়াগা থেকে জীবাণু ধ্বংসে ক্লোরিন ব্লিচ কাযর্করী নয় বরং এক্ষেত্রে ফরমালডিহাইড ব্যবহার করতে হবে। আক্রান্ত বাক্তির কাপড় পুড়িয়ে ফেলা জীবাণু ধ্বংসের একটি কাযর্কর পদ্ধতি। মানুষ আক্রান্ত হবার পর যত দ্রুত সম্ভব অ্যানথ্রাক্স জীবাণুনাশক দিতে হবে, যত দেরি হবে জীবনের ঝুঁকি তত বাড়বে। মানুষের জন্য অ্যানথ্রাক্স টিকা প্রথম আসে ১৯৫৪ সালে।
অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে দুই ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে। প্রথমত, যাদের গরু, মহিষ, ছাগলের মতো গবাদি পশু রয়েছে, তারা যেন তাদের পশুকে নিয়মিত অ্যানথ্রাক্সের টীকা দেন তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পশুর যদি অ্যানথ্রাক্স হয়েই যায়, সেক্ষেত্রে পশুকে দ্রুত মাটির নিচে পুঁতে ফেলা প্রয়োজন।
অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর মাংস খেয়ে পরিপাকতন্ত্রে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশে সাধারণত যেভাবে মাংস রান্না করে খাওয়া হয় তাতে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু মাংসে টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে বিদেশে ‘হাফ ডান’ অবস্থায় মাংস রান্না করে খাওয়া হয়, সেই পদ্ধতিতে রান্না করলে মাংসে জীবাণু থাকার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে যেভাবে মাংস রান্না করা হয়, ওই পদ্ধতিতে রান্না করলে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু থাকার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তবে, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর মাংস না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

















