শ্রমিক আন্দোলন, নাকি অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে অন্য কোনো শক্তি?
প্রান্ত পারভেজ তালুকদার : মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ-ভাঙচুর; আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, বাড়ছে উদ্বেগ
রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন ক্রমেই সহিংস রূপ নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন, নাকি এর আড়ালে সক্রিয় রয়েছে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল?
শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি নতুন নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করছেন শ্রমিকরা। বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সেটি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন তারা।
কিন্তু অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনে যখন সড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়িতে আগুন, কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটছে, তখন আন্দোলনের প্রকৃতি ও নেপথ্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
গত ১ নভেম্বর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির কারণে ৫২৯টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত হয় বলে বিজিএমইএর তথ্যের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিকদের দাবি পর্যালোচনার উদ্যোগের মধ্যেও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
আন্দোলনের আড়ালে রাজনৈতিক তৎপরতা?
শ্রমিক আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে। ২ নভেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ১৯ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।
অন্যদিকে, মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার এক আত্মীয়ের বিরুদ্ধে লোকজন সংগঠিত করে আন্দোলনে যুক্ত করার অভিযোগ তুলেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ২৯ জনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। এসব অভিযোগও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পরিকল্পিত সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কথিত প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনার সঙ্গে চলমান শ্রমিক আন্দোলনের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু শ্রমিক বা মালিকপক্ষ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।
২ নভেম্বরও আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সড়কে নামলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
প্রশ্ন এখন কয়েকটি
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে কারখানা, যানবাহন ও সরকারি সম্পদে হামলা কিংবা অগ্নিসংযোগের দায়ও নির্ধারণ করতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রমিকদের প্রকৃত দাবির সঙ্গে কারা মাঠে রয়েছেন? কারা আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন? কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী কি পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে? আর যদি এমন কোনো পরিকল্পিত তৎপরতা থেকে থাকে, তাহলে তার নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী?
দেশের স্থিতিশীলতা, শ্রমিকদের অধিকার এবং অর্থনীতির স্বার্থে এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আবার শ্রমিকদের আবেগ ও অধিকারকে ব্যবহার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো অপচেষ্টাকেও ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান।
